পাহাড়ি ঢলে সিলেটে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, নদ-নদীর ও নিম্নাঞ্চলে হু হু করে বাড়ছে পানি

জুমাস ডেস্ক: কয়েকদিনের লাগাতার ভারি বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলায় আকস্মিক সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিয়েছে। এতে প্লাবিত হয়েছে এই তিন উপজেলার বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চল।

আকস্মিক বন্যায় দুর্ভোগে পড়েছেন এ সকল উপজেলার কয়েক লক্ষ মানুষ। পরিবার পরিজন, গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

বুধবার (২৯ মে) বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলে হু হু করে বাড়তে শুরু করে পানি। গতরাতে অনেকের ঘরে গলা পর্যন্ত পানি উঠে যায়। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর মানুষ। অনেকে রাতে নৌকা নিয়ে তাদের উদ্ধার করতে ভার্চুয়াল মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন।

বুধবার (২৯ মে) রাত ১১টা ৯ মিনিটে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ময়নারহা খেয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা ‘সাজিদুর রহমান সাজন নামে এক যুবক সাহায্যের আকুতি জানিয়ে’
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন- ‘হায়রে ফেরী ঘাটের নৌকা, একটা নৌকা নাইনি বাছাইবার লাগি’।

লাশ উদ্ধার অইমু হয়তো, জীবিত উদ্ধার অইতে পারতাম না, হয়তো এইটা শেষ পোস্ট’—এভাবেই বাঁচার আকুতি জানান সাজিদুর সাজন।

এর আগে রাত ১০টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সাজিদুর রহমান সাজন লেখেন, ‘আমি দৌলা চেয়ারম্যানের ভাতিজা দিলু মিয়ার পোয়া, বাড়ি ফেরিঘাট। আমরারে কেউ বাঁচাও, আমরার মরণ সামনে, কেউ বাঁচাও আমরারে, মা ভাই লইয়া আটকিগেছি।

আকুতি জানিয়ে সাজিদুর রহমান আরও লেখেন, ‘অনেক স্রোতের কারণে কেউ উদ্ধারের জন্য আসতে পারছে না, সুন্দর এই ভুবনে বাঁচার অনেক ইচ্ছা। ’

সাজনের মতো জৈন্তাপুর উপজেলার আরও কয়েকটি জায়গা থেকে উজানের ঢলে আকস্মিক বন্যায় আটকে পড়া কয়েকজন নৌকা চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন।

জৈন্তাপুরের ময়নাহাটি খেয়াঘাট এলাকার আহমেদ নাইম রাত সাড়ে দশটায় ফেসবুকে লেখেন- ‘একটা ইঞ্জিন নৌকার দরকার, কেউ বাঁচাও আমরারে’।

এদিকে উদ্ধার কাজে সেনাবাহিনী চেয়ে জৈন্তাপুর উপজেলার একজন বাসিন্দা ফেসবুক আইডিতে লেখেন, উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী নিয়োজিত করা জরুরি। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাটে ভয়াবহ বন্যা। তিনি এই পোস্টে ট্যাগ করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে।

জানা গেছে, আকস্মিক ভাবে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিচ্ছে।
ইতোমধ্যেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র। পানিবন্দি মানুষরা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে উঠতে শুরু করেছেন।

আরও জানা গেছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়ন, লেঙ্গুড়া, ডৌবাড়ি, নন্দীরগাঁও, পূর্ব ও পশ্চিম আলীরগাও, পশ্চিম জাফলং, মধ্য জাফলংয়ে প্লাবনের পরিমাণ বেশি হয়েছে। এই উপজেলা ১৩ টি ইউনিয়নে মোট ৫৬ টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রয়েছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও প্লাবন প্রবণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে জনগণকে দ্রুত অবস্থান নিতে মাইকিং করা হচ্ছে।

এছাড়া সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়ক তলিয়ে যাওয়ার কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

জৈন্তাপুর উপজেলায় নিজপাট লামাপড়া, বন্দরহাটি, ময়নাহাটি, জাঙ্গালহাটি, বড়খেলা, মেঘলী, তিলকৈপাড়া, ফুলবাড়ী, নয়াবাড়ী, হর্নি, বাইরাখেল, গোয়াবাড়ী, ডিবির হাওর, ঘিলাতৈল, মুক্তাপুর, বিরাইমারা হাওর, খারুবিল, লমানীগ্রাম, কাটাখাল, বাউরভাগ ও বাওন হাওরসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র।

এছাড়াও প্লাবিত হয়েছে কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাটের বিভন্ন এলাকা। গ্রামীণ সড়ক ডুবে যোগাযোগ ব্যাহত রয়েছে অনেক জায়গায়।

সিলেটের আবহাওয়া অফিস বলছে, গত ২৪ ঘন্টায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটের ১৯.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোবারক হোসেন জানান, ইতোমধ্যেই গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলায় আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্রে পানিবন্দী মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলতেছে।

এছাড়া আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে। সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের সার্বক্ষণিক তদারকি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ধারাবাহিক ভারি বৃষ্টি ও নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারনে সিলেটে সুরমা, কুশিয়ারা ও সারি-গোয়াইনসহ প্রত্যেকটি নদীতে পানি বেড়ে বিপৎসীমা উপর দিয়ে অতিক্রম করছে।

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *