সালুটিকর বধ্যভূমি একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার স্মৃতি ধরে আছে। ঐতিহাসিক গুয়েতেমালার চেয়েও জঘন্য টর্চার সেল ছিল সিলেট ক্যাডেট কলেজের পাশের এ বধ্যভূমি। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও স্থানটি অযত্ন অবহেলায় পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাধারণ জনগণের ত্যাগকে সবার সামনে তুলে ধরতেই শহীদ স্মৃতি উদ্যান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে তুলে নেওয়া বীর বাঙালিদের নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। সিলেটের ক্যাডেট কলেজের পূর্ব দিকের টিলায় কাউকে গুলি করে আবার কাউকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়। নিখোঁজ হওয়াদের পরিবার গত ৫২ বছর ধরে শ্রদ্ধা জানানোর স্থান পান নি। সিলেটে শনিবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার শহীদ স্মৃতি উদ্যান উদ্বোধনের মাধ্যমে শহীদ পরিবার এবার পেলেন গর্বিত পূর্বসূরীদের শ্রদ্ধা জানানোর একটুকরো স্থান। এ সময় শহীদ পরিবারের সদস্যরা আবেগ ধরে রাখতে পারেন নি।
স্বাধীনতার বায়ান্ন বছর পর সিলেটে গণহত্যার শিকার শিকার ৬৬ শহীদকে সম্মান জানানোর জন্য একটি উদ্যান করা হয়েছে। শহীদ পরিবারের সন্তানেরা পিতা মাতাকে শ্রদ্ধা জানানোর স্থান পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা যার যার ধর্মমতে দোয়া, প্রার্থনা আর কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। পূর্বসূরিদের বীরত্বের কথা সশস্ত্র চিত্তে স্মরণ করেন তারা। শ্রদ্ধা জানানোর স্থান পেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপও রয়েছে তাদের।
সিলেট সদর উপজেলার ক্যাডেট কলেজের পূর্ব পাশে টিলায় ১৯৭১ সালে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে ধরে এনে নৃশংসভাবে গুলি করে কিংবা নির্যাতন করে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে এ টিলায়। পিতা মাতার মৃত্যুর সংবাদ জানলেও শেষ দেখা কারো ভাগ্যে জুটে নি। গত ৫২ বছর ধরে শহীদ পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা জানাতে পারেন নি। শনাক্ত হয় নি তাদের কবর কোথায়।
শহীদ পরিবারের সদস্য শেহরীন চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি খুব ছোট। এপ্রিলে পাকিস্তানি হানাদাররা আমার বাবাকে বাসা থেকে তুলে নেয়। এরপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। গড ৫২ বছর তার সন্ধান করেছি। কোথাও বাবাকে শ্রদ্ধা জানানোর স্থান ছিলো না। আমার মা আমৃত্যু বাবার সন্ধান করেছেন। তিনি ৬ বছর আগে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি বলে গেছেন, বাবা ফিরবেন। আমি যেনো অন্য লোক মনে করে, তাকে না ফিরাই। বাবা আজ ফিরেছেন। তার নিজের ঘরে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। আমরাও শ্রদ্ধা জানানোর স্থান পেয়েছি।

শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদের ছেলে ও শহীদ স্মৃতি উদ্যান বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ডা. জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিলেট ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন টিলা হওয়ায় এখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার অনেকটা সীমিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ও শহীদ পরিবারের সহযোগিতায় গণহত্যার শিকার শহীদ বীর বাঙ্গালীকে শনাক্ত করে আলাদা আলাদা নামফলক স্থাপন করা হয়েছে। যাতে শহীদ পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। এটা কোনো কবরস্থান নয়, এ উদ্যানে যে কেউ আসলে যাতে জানতে পারেন পূর্বসূরীদের ত্যাগের ইতিহাস।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও শহীদ স্মৃতি উদ্যান বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য অপূর্ব শর্মা বলেন, শহীদ স্মৃতি উদ্যানে শহীদদের তালিকা প্রণয়নে স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে গিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়াও আরো যাদের নাম পাওয়া যাবে, অনুসন্ধান করে, সত্যতা পেলে তাদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বায়ান্ন বছর পর শ্রদ্ধা জানানোর স্থান পেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার প্রত্যাশা এবার গণহত্যার শিকার শহিদ পরিবারের সদস্যদের।
![]()
