বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি থাকছে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কয়েক দফা বাড়িয়েছে সরকার। এতে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংকটে আছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কয়েক দফা বাড়ানোর পরও চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব খাতে ভর্তুকি বাবদ বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বকেয়া ভর্তুকির দায় মেটাতে নতুন অর্থবছরের এই বাড়তি বরাদ্দের অর্থ ব্যয় হবে।তবে আগামী অর্থবছরে নিট ভর্তুকি কমানো হবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আগামী অর্থবছরেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি রাখার পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভর্তুকি কমাতে গেলে জ্বালানির দাম আরো বাড়বে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় আরেক দফা বাড়তে পারে। তবে আগামী বাজেট নির্বাচনী বাজেট হওয়ায় সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে সরকার আইএমএফের নির্দেশগুলোর সব দিক বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ধীরে চল নীতি গ্রহণ করেছে।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে ৮১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য আগামী ১ জুন যে বাজেট আসছে, তাতে এসব খাতে মোট বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাখা হতে পারে। নতুন অর্থবছরে নিট ভর্তুকির পরিমাণ এবারের চেয়ে না বাড়লেও মূলত চলতি অর্থবছরের ভর্তুকির বকেয়া মেটাতেই বাড়তি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে আইএমএফ প্রশ্ন তুলেছে।তাতে এবারের তুলনায় আগামী অর্থবছরে নিট ভর্তুকির পরিমাণ অনেক কমে যাবে। তবে এবারের ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া দরকার, তা দেওয়া যায়নি। ফলে বিভিন্ন খাতে বকেয়া থেকে যাচ্ছে, যা আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ দিয়ে মেটানো হবে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভর্তুকি তুলে দিলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আরো বাড়তে পারে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে পারিবারিক পর্যায়েও খরচ বেড়ে যাবে।ফলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যেতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর হবে। তাই এই খাতে ভর্তুকি রাখতেই হবে।’

বিদ্যুতে ভর্তুকি রাখা হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি : অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ এ খাতে অতিরিক্ত সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দাবি করার পর চলতি বছর তিন দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে সরকারের সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বাড়িয়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে এ বছর প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন ছিল; মূল্যবৃদ্ধি ও বাড়তি বরাদ্দ মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ পাচ্ছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট ভর্তুকি বকেয়া থেকে যাচ্ছে, যা আগামী বাজেটের বরাদ্দ থেকে পরিশোধ করা হবে। আগামী বাজেটের পর আরেক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আগামী বছর এ খাতে নিট ভর্তুকির চাহিদা কমে যাবে। কিন্তু এবারের ভর্তুকি বকেয়া থাকার কারণে তা পরিশোধের জন্য নতুন বাজেটে এ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে| 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতে ভর্তুকি তুলে দিলে দাম বাড়বে। এতে মানুষের ব্যয় বেড়ে যাবে। অনেক বিলাসীপণ্য ক্রয় কমে যাবে। অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ও কমবে। এতে কর্মসংস্থানও কমে যাবে। মোটকথা, একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হবে।

Loading