জুমাস ডেস্ক: “অস্ট্রেলিয়াকে প্রায় তিনশ রান তাড়া করতে নেমে ৯১ রানে নেই ৭ উইকেট। আফগানিস্তানের বোলারদের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন একজন, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। খেললেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্বরণীয় এক ইনিংস। খুব সম্ভাবনা জাগিয়েও রূপকথার ভেলায় চড়ে স্বপ্নীল আরেকটি জয় পাওয়া হল না আফগানদের। অবিশ্বাস্য প্রত্যবর্তনে তাদের থামিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনারে জায়গা করে নিল অস্ট্রেলিয়া।”
গতকাল মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ত্রয়োদশ আসরের ৩৯তম ম্যাচে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার জয় ৩ উইকেটে। ২৯২ রানের লক্ষ্য ১৯ বল হাতে রেখে পূরণ করে অজিরা। ম্যাক্সওয়েল শুধু চার আর ছয় মেরেই অস্ট্রেলিয়াকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান এবং উপহার দিলেন অবিশ্বাস্য এক জয়। ১২৮ বলে ২০১ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলেছেন ম্যাক্সওয়েল। যেখানে ১০টি ছক্কার পাশে চার ২১টি। মুজিব-উর রহমানের করা ৪৭তম ওভারে টানা চার বলে তিন ছক্কা ও এক চারে দলের জয়ের সাথে সাথে ক্যারিয়ারের প্রথম দ্বিশতক পূরণ করেন এই মিডলঅর্ডার ব্যাটার। অল্প রানে এই মুজিবের হাতেই জীবন পেয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল। মুজিব ছেড়েছিলেন সহজ ক্যাচ। তারই মাশুল দিতে হলো দলের। অষ্টম উইকেটে প্যাট কামিন্সকে নিয়ে ১৭০ বলে ২০২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন ম্যাক্স। অষ্টম উইকেটে যা অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ড জুটি। যেখানে কামিন্সের অবদান ৬৮ বলে মাত্র ১২ রান। এই মাঠে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড এটি। ২০১৭ সালে ভারতের বিপক্ষে এখানে ২৮১ রানের লক্ষ্য তাড়ায় জিতেছিল নিউজিল্যান্ড। বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ডও এটিই। আগের রেকর্ডও ছিল ভারতের মাটিতে। ১৯৯৬ আসরের কোয়ার্টার-ফাইনালে চেন্নাইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৮৭ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ৬ উইকেটে জিতেছিল তারা। আফগানদের হয়ে দুটি করে উইকেট নেন নাভিন-উল হক, আজমতউল্লাহ ওমরজাই ও রশিদ খান। টসজয়ী আফগানদের ব্যাট হাতে একাই টানেন ইব্রাহিম জাদরান। এই ওপেনারের অপরাজিত শতকে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৯১ রান করে আফগানরা। ১৪৩ বলে সর্বোচ্চ ১২৯ রানে অপরাজিত থাকেন ইব্রাহিম। দলকে ভালো শুরু এনে দেয়ার পথে ছিলেন আফগান দুই ওপেনার রহমানুল্লাহ গুরবাজ ও ইব্রাহিম। ৮ ওভারে ৩৮ রান যোগ হবার পর বিচ্ছিন্ন হন তারা। ২টি চারে ২১ রান করা গুরবাজকে শিকার করেন অস্ট্রেলিয়ার পেসার জশ হ্যাজেলউড। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন ইব্রাহিম ও ইনফর্ম রহমত শাহ। ১৮তম ওভারে ষষ্ঠ হাফ-সেঞ্চুরি করেন জাদরান। তার ৬২ বলের হাফ-সেঞ্চুরিতে ২১তম ওভারে ১শ রান পার করে আফগানিস্তান। ২৫তম ওভারে অস্ট্রেলিয়াকে ব্রেক-থ্রু এনে দেন স্পিনার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ৩০ রান করা রহমতকে শিকার করেন ম্যাক্সওয়েল। দ্বিতীয় উইকেটে ১০০ বলে ৮৩ রানের জুটি গড়েন রহমত-ইব্রাহিম। চলতি বিশ্বকাপে এই নিয়ে তৃতীয়বার দ্বিতীয় উইকেটে হাফ-সেঞ্চুরির জুটি গড়লেন তারা। রহমত ফেরার পর ক্রিজে ইব্রাহিমের সঙ্গী হন অধিনায়ক হাসমতুল্লাহ শাহিদি। এই জুটি থেকেও হাফ-সেঞ্চুরি আসে। কিন্তু জুটিতে ধীরলয়ে খেলেছেন দু’জনই। ৪৩ বলে ২৬ রান করা শাহিদিকে বোল্ড করে জুটি ভাঙ্গেন পেসার মিচেল স্টার্ক। এই আউটে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২৬বার প্রতিপক্ষ ব্যাটারকে বোল্ড করা বোলার হিসেবে রেকর্ড দখলে নেন স্টার্ক। শাহিদি-ইব্রাহিম ৭৬ বলে ৫২ রান যোগ করেন। সর্বশেষ চার ম্যাচেই তৃতীয় উইকেটে আফগানরা হাফ-সেঞ্চুরি পেয়েছিলো। পাঁচ নম্বরে দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেন আজমতুল্লাহ ওমরজাই। স্টার্ক ও স্পিনার এডাম জাম্পাকে ২টি ছক্কাও মারেন তিনি। কিন্তু ভালো শুরুর পরও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি তিনি। জাম্পার বলে শিকার হবার আগে ১টি চার ও ২টি ছক্কায় ১৮ বলে ২২ রান করেন ওমরজাই। ওমরজাই ফেরার পর ৪৪তম ওভারে ২৭ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে পঞ্চম সেঞ্চুরি পূর্ন করেন ইব্রাহিম। বিশ্বকাপে প্রথম আফগান ব্যাটার হিসেবে সেঞ্চুরি করতে ১৩১ বল খেলেন তিনি। আফগানিস্তানের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫টি সেঞ্চুরি করলেন ইব্রাহিম। বয়স বিবেচনায় ২১ বছর ৩৩০ দিনে সর্বকনিষ্ট ব্যাটার তালিকায় বিশ্বকাপ সেঞ্চুরিতে চতুর্থস্থানে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। সেঞ্চুরির পর দলের রান গতি বাড়িয়েছেন ইব্রাহিম। পাশাপাশি ইনিংসের শেষ দিকে ঝড়ো ইনিংস খেলেছেন রশিদ খান। এতে ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৯১ রানের বড় সংগ্রহ পায় আফগানিস্তান। বিশ্বকাপ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে এটিই সর্বোচ্চ রান আফগানদের।৮টি চার ও ৩টি ছক্কায় ১৪৩ বলে ১২৯ রানে অপরাজিত থাকেন ইব্রাহিম। ২টি চার ও ৩টি ছক্কায় মাত্র ১৮ বলে ৩৫ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন রশিদ। অস্ট্রেলিয়ার হ্যাজেলউড ২টি, স্টার্ক-ম্যাক্সওয়েল ও জাম্পা ১টি করে উইকেট নেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
আফগানিস্তান: ৫০ ওভারে ২৯১/৫ (রহমানউল্লাহ ২১, ইব্রাহিম ১২৯*, রহমত ৩০, শাহিদি ২৬, আজমতউল্লাহ ২২, নবি ১২, রশিদ ৩৫*, অতিরিক্ত ১৬;
বোলিং: স্টার্ক ৯-০-৭০-১, হ্যাজেলউড ৯-০-৩৯-২, ম্যাক্সওয়েল ১০-০-৫৫-১, কামিন্স ৮-০-৪৭-০, জাম্পা ১০-০-৫৮-১, হেড ৩-০-১৫-০, স্টয়নিস ১-০-২-০)।
অস্ট্রেলিয়া: ৪৬.৫ ওভারে ২৯৩/৭ (ওয়ার্নার ১৮, হেড ০, মার্শ ২৪, লাবুশেন ১৪, ইংলিশ ০, ম্যাক্সওয়েল ২০১*, স্টয়নিস ৬, স্টার্ক ৩, কামিন্স ১২*, অতিরিক্ত ১৫;
বোলিং: মুজিব ৮.৫-১-৭২-০ নাভিন ৯-০-৪৭-২, আজমতউল্লাহ ৭-১-৫২-২, রশিদ ১০-০-৪৪-২, নূর ১০-১-৫৩-০, নবি ২-০-২০-০)।
ফল: অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: গ্লেন ম্যাক্সওয়েল।
![]()
