বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে

ডলার সংকটের এই সময়ে, প্রবাসী আয় আসায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর পণ্য রপ্তানিও বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, বেশি বেড়েছে পোশাক রপ্তানি।

ডলার–সংকট নিয়ে বছরখানেক ধরেই দেশের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মূল দুই উৎস রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি নিয়েও মাঝে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি উভয়ই বেড়েছে। প্রবাসী আয় আসায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর পণ্য রপ্তানিও বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য রপ্তানিতে নতুন মাইলফলকে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের পণ্য, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও সরকার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। সেই লক্ষ্যের চেয়ে রপ্তানি কম হয়েছে ৪ দশমিক ২১ শতাংশ বা ২৪৪ কোটি ডলার।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ১৬ মাস আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়, এমন পণ্যের বিক্রি কমে যায়। বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে, সেসবের ক্রয়াদেশও কমে। আবার দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদনও ব্যাহত হয়। তারপরও পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থবছর শেষ হওয়াটা ইতিবাচক।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল সোমবার রপ্তানি আয়ের এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, শুধু গত জুনে ৫০৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের জুনের তুলনায় এই রপ্তানি ২ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। জুন ছাড়াও গত নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়।

ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট পণ্য রপ্তানিতে তৈরি পোশাকশিল্পের হিস্যা সাড়ে ৮৪ শতাংশ। দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হোম টেক্সটাইলে রপ্তানি কমেছে। তার মানে মূলত এক তৈরি পোশাকশিল্পের কল্যাণেই পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারায় রয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত পরশু অর্থাৎ রোববার জানায়, সদ্য বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে বৈধ পথে প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ১৬১ কোটি ডলার। এর আগের অর্থবছরে এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার। সে হিসাবে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী আয় কমেছিল ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ।

রপ্তানি বৃদ্ধির কিছুটা প্রভাব আছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে। এখন এর পরিমাণ ৩ হাজার ১১৪ কোটি ডলার। ব্যাংকগুলোতেও ডলারের প্রবাহ আগের চেয়ে বেড়েছে। আমদানি কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ। যদিও এখনো আগের আমদানি বিল পরিশোধ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের হিস্যা বেড়েছে

বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। তার আগের অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৪ হাজার ২৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। তার মানে বিদায়ী অর্থবছরে পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ৪৩৮ কোটি ডলার।

বিদায়ী অর্থবছর অন্য খাতের রপ্তানি কমায় সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে তৈরি পোশাক খাতের হিস্যাও বেড়েছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানিতে পোশাক খাতের হিস্যা ছিল ৮১ দশমিক ৮১ শতাংশ। গত অর্থবছর সেটি সাড়ে ৮৪ শতাংশ হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত সংকটের মধ্যেও পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি আমাদের আশা জাগাচ্ছে। তবে অধিকাংশ কারখানাই ক্রয়াদেশ ও জ্বালানি–সংকটে ভুগছে। ওভারটাইম বন্ধ। মোটাদাগে ১০ শতাংশ কারখানা বাদে বাকিগুলো ২০-৪০ শতাংশ কম সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে।’

অবশ্য সামনের মাসগুলোতে তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক আরশাদ জামাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈশ্বিক রাজনৈতিক কারণে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশই ভালো বিকল্প। আগামী ডিসেম্বরে শ্রমিকের মজুরি যতই বাড়ুক না কেন, সেটি মোটামুটি বজায় থাকবে। আবার বাংলাদেশের কারখানাগুলো গত বছর উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনামে তৈরি পোশাক উৎপাদন ব্যয়বহুল। তারা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক তৈরি করে। আর আমরা উৎপাদন করি কটন পোশাক। ফলে ভিয়েতনাম সেই অর্থে আমাদের প্রতিযোগী নয়। সেপ্টেম্বরের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বড় কোনো অবনতি না হলে পোশাক রপ্তানিতে বড় কোনো সমস্যা হবে না।’

চামড়া, পাট ও হোম টেক্সটাইল ভুগছে

তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য বড় কোনো খাতের রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় নেই। অপেক্ষাকৃত ছোট খাত হিসেবে পরিচিত চামড়াবিহীন জুতা ও প্লাস্টিক খাতের রপ্তানি বেড়েছে।

বিদায়ী অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি হয়েছে ১২২ কোটি ডলারের। তার মধ্যে চামড়া ১২, চামড়াজাত পণ্য ৪০ ও চামড়ার জুতা ৭০ কোটি ডলারের। সামগ্রিকভাবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে পৌনে ২ শতাংশ।

দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি খাত হোম টেক্সটাইল। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে ১১০ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তার আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ১৬২ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল। তার মানে গত বছর রপ্তানি কমেছে ৩২ শতাংশ।

চামড়া ও হোম টেক্সটাইলের মতো পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য—এই দুই খাতের রপ্তানিও কমেছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে এই চার খাতের রপ্তানি ছিল ১০০ কোটি ডলারের বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারের নিচে নেমেছে।

ইপিবির তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছর ৯১ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ১১৩ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে গত বছর রপ্তানি কমেছে ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৮৪ কোটি ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে এই খাতের রপ্তানি ছিল ১১৬ কোটি ডলারের।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম রপ্তানি নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানির বড় বাজারগুলোর ভোক্তারা মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের কারণে চাপে রয়েছেন। তা ছাড়া ডলারের বিপরীতে দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।

ফলে আগামী ছয় মাস তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য খাতের রপ্তানিতে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। এমন প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সেসব খাতের ওপর নজর রাখতে হবে। ব্যবসায় ধরে রাখতে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তাও দিতে হবে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, রপ্তানিতে যেসব খাত ভালো করছে, তারা যেন কাঁচামাল আমদানি ও গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মধ্যে না পড়ে, সেটিও নজরদারিতে রাখতে হবে। একই সঙ্গে এই খাতগুলোর রপ্তানি বাড়াতে কোনো সহায়তা দিতে হলেও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

Loading